সাপ্তাহিক চাকরির খবর সবার আগে

উঠতে দেরী হয়ে যাওয়ায় খুব তাড়াহুড়ো লেগে গেল

সেদিন সারাটারাত আমি ঘুমোতে পারি নিভুল মানুষ টা কে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালবেসে ফেলাযন্ত্রণায় ছটফট করেছি। আমার বোকা বোকা ভালবাসার কোনো অর্থ যার জানা ছিল না,তার কাছেই নিজেকজাহির করতে গিয়েছি বারবার।

ধাক্কাটা সামলে উঠতে নিজেকে একটু একটু করে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হয়েছে আমার।য়েছিতাই বলে কি বেঁচে থাকা ভুলে যাব? যে চলে গেছে,তার প্রতি সমস্ত পিছুটান ভুলে থাকা শিখতযে আমার আবেগ অনুভূতির বিন্দুমাত্র মূল্য দেয় নিতার প্রতি অনুভূতিহীন হয়ে যাওয়া শিখতে হবে।

নিঃসঙ্গতায় ভুগেছি অনেক। সংগী ছাড়া নিঃসঙ্গতার মুক্তি নেই। তাই বিষণ্ণ বিকেলের গরম ধোঁয়া উঠা কফির মগেও আমি সংগ খুঁজেছি। পুরোটা জীবন কাঁচ হয়ে থাকার কারণে বারবার শুধু ভেঙে চুরমার হয়েছি কিন্তু এবার শুধু পাথর হয়ে থাকবো,চাইলেও কেউ যেন আর সহজে ভাঙতে না পারে।

পরের শুক্রবার বিকালে ধানমণ্ডির একটা রেস্টুরেন্টে ছেলের সাথে দেখা করতে গেলাম।মুখোমুখচেয়ারে চুপচাপ বসে আছি দুজন। ৫ ফিট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার মানুষটার বেশভূষায় আভিজাত্যের কোনো ছোঁয়া নেই। গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ,চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মাথাভর্তি ঘন চুল, খোচা খোচা চাপদাড়ি।

সব মিলিয়ে আহামরি কিছু মনে না হওয়ায় আমার পাশে তাকে কতটা মানাবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান হচ্ছিলাম আমি। তারেকের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে তিনিই পাত্রী। লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে আছেন একদম। বিরক্ত লাগছে আমার।

গ্রামের ছেলে আমি।বাবা-মা কে হারিয়েছি খুব ছোটবেলায়। তারপর মামা-মামীর কাছে বড় হওয়া। সারাদিন মাঠে কাজ করে সন্ধ্যেবেলা পড়তে বসতাম। মামার আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না বলে খুব হিসেব করে চলতে হত।

গ্রাম থেকে এইচ.এস.সি পাশ করার পর ঢাকা ভার্সিটি তে চান্স পেয়ে যাই। তারপর ঢাকায় এসে শুরু হয় নতুন জীবনযুদ্ধ। নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেরই চালাতে হত। টা টিউশনি করার পর নিজে পড়ার সময় পেতাম রাতের বেলা।

খুব ক্লান্ত লাগতো তারপরও কষ্ট করে রাত জেগে পড়তাম। ক্যাম্পাসে আমার তেমন কোনো বন্ধু ছিল না। তাদের কাছে আমি ক্ষ্যাত হিসেবে গণ্য ছিলাম।কেউ আমার সাথে মিশতে চাইতো না। শুধুমাত্র ক্লাসের সবচেয়ে ভাল স্টুডেন্ট ছিলাম বলে পরীক্ষার আগে আগে.

কেউ কেউ খাতির জমাতে আসতো তারপর নোটস নিয়ে যেত।মেয়েদের নজরে পরি নি কোনোদিস্ট্রাগল করতে করতে জীবনে বিলাসিতা,ইচ্ছা,আকাঙ্ক্ষা বলে যে কিছু আছে,সেটাই ভুলে বসেছিলাম। ব্যাপার টা তেমনভাবে কখনো স্পর্শ করে নি আমাকে। কিভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো.

সারাক্ষণ শুধু এই চিন্তা করতাম। আশেপাশের চাকচিক্যতার দিকে তাকানোর সুযোগ ছিল না। আসুযোগ হয়েছে তখন মানসিক ইচ্ছা টা ছিল না। স্যরি,অনেক কথা বলে ফেললাম। আপনি খাচ্ছেন না কেন হুম? হ্যাঁ এইতো খাচ্ছি।

কখন যে আমি তারেকের কথার মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম,টের পাই নি। খেয়াল করে দেখলাম,বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারেন ভদ্রলোক।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যে যার মত বাসায় চলে গেবাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে এক কাপ চা নিয়ে বাবার ঘরে গেলাম। বাবা তখন বই পড়ছিলেন। চায়ের কাপ টা বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বাবার পাশে গিয়ে বসলাম। বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে বাবা আমায় জিজ্ঞেস করলেনকিছু বলবি মা?

আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। তারপর খানিকক্ষণ সময় নিয়ে জানতে চাইলামবাবা,তুমি তো চাইলে এর চেয়েও আরো অনেক ভাল পাত্র নিয়ে আসতে পারতে আমার জন্য। আরো বেশি অবস্থাসম্পন্ন,দর্শন পাত্রের খোঁজ ঘটক নিয়ে এসেছিলেন।

তাহলে সেসব বাদ দিয়ে এই ছেলের সাথে কেন আমার বিয়ে ঠিক করলে? না,আমি কিন্তু আপত্তজানাচ্ছি না। তোমার সিদ্ধান্ত কে আমি সম্মান করি। আমি শুধু জানতে চাচ্ছি,এই ছেলের মধ্যে কি এমন দেব্যাংকের জব টা ছাড়া আর কি আছে এই মানুষটার?

চায়ের কাপে শেষ চুমুক টা দিয়ে আমার মুখোমুখি সোফায় বসলেন বাবা। আমার দু’হাত তার হাতের মুঠোয় বন্দি করে নিলেন ছোটবেলায় তুই যখন আমার হাতের আঙুলে ভর দিয়ে ছোট ছোট পা ফেলে টুকটুক করে পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াতিস.

তখন হঠাৎ আঙুল ফসকে তুই পড়ে যেতে নিলে খপ করে আমি তোকে ধরে ফেকোলে নিআদরে আদরে ভরিয়ে দিতাম। আমি সাথে থাকলে তুই দৌঁড়ে দৌঁড়ে স্কুলের গেটের ভিতঢুকতিস,কারণ তুই পড়যেতে নিলে আমি তোকে ঠিক সামলে নিবো,এ ভরসাটুকু আমার উপর তোর ছিল।

তাই আমি চাই আমার মতোই আরেকটা ভরসার হাত তোর মাথার উপর থাকুক সবসময়।যে হাআমার অনুপস্থিতি তে ঠিক তোকে সামলে নিতে পারবে। এই যুগে যোগ্য হাত পাওয়া সহজ, কিন্তু নির্ভরশীল হাত পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।তারেকের মধ্যে আমি সেই নির্ভরতা খুঁজে পেয়েছি।

সে হয়তো তোকে আমার মত বিলাসী জীবন দিতে পারবে না, কিন্তু একটা সুন্দর স্বাভাবিক জীবন দিতে পারবে।বিলাসী জীবনযাপনে অসামঞ্জস্যতা অস্বাভাবিকতা থাকে বেশি। তারেকের মতসরল,মেধাবী,পরিশ্রমী,সৎ,কর্মঠ এবং আদর্শবান ছেলে পাওয়া খুব কঠিন এখন।

বাহ্যিকভাবে সে আহামরি কিছু না হলেও,আমার বিশ্বাস তুই যত ওর ভেতরে প্রবেশ করতে পারবি ততই তলিয়ে যাবি।তাছাড়া আমি ছেলের টাকা-পয়সা দেখি নি। কারণ আমার যা আছে সেসব তো তোরই হবে। তুই কি তোর উত্তর পেয়েছিস?

চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টায় আমি বাবার বুকে মুখ লুএরপর থেকে শুরু হল টুকটাক ফোনালাপ। তারেকের সাথে প্রায়ই আমার রাতজেগে কথা হত। সারাদিন পরিশ্রম করে রাতজেগে তিনি প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় সব কথা নিরলসভাবে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।

ফারহানের সাথেও আমি রাতজেগে কথা বলতাম,কিন্তু এতটা স্বস্তি পেতাম না,যতটা স্বস্তি তারেকের সাথে পাই। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে বলে মানুষ টা আমাকে তার সম্পত্তি ভেবে নেন নি। যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে শালীনতার মধ্যে আমার সাথে মিশতেন।

দিনের পর দিন এক অজানা ভালোলাগায় ডুবে যাচ্ছিলাম আমি। এর আগেও আমি ভালবেসেছি,তবে প্রেমে পড়ি নি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে, প্রেম আমার উপর পড়ে গেছে। বাবা ঠিকই বলেছিলেন,তারেকের যত ভেতরে আমি প্রবেশ করতে পারবো ততই আমি তলিয়ে যাব।

তলিয়েই তো যাচ্ছি। অসময়ের গুণগুণ সুরে আমি শুধু তারেক কে ই খুঁজে পাই। তার স্বচ্ছতা আমাকে ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে। তার সহজ সরল অনুভূতির কাছে আমি মাথা নোয়াতে বাধ্য হই। ধীরে ধীরে আমি অনুধাবন করতে লাগলাম অনুভূতিরব কিছুই সময়ের সাথে বদলে যায়।

বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলো। একদিন বিকেলবেলা মা আমাকে তারেকের সাথে শপিং করতে পাঠালেন। প্রথমদিন তাকে দেখে আমার আহামরি কিছু মনে হয় নি। কিন্তু এবার তাকে দেখে মনে হচ্ছে, তার থেকে সুদর্শন পুরুষ পৃথিবী তে আর একটাও নেই।

আসলে দেখার জন্যও একটা সুন্দর দৃষ্টি প্রয়োজন,যা আমার আগে ছিল না। শপিং শেষ করে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দুজন একসাথে ফুচকা আর টং দোকানের চা খেলাম। বাড়ি ফেরার সময় খুব মন খারাপ হচ্ছিলো আমার। তাকে ছাড়তেই ইচ্ছে করছিলো না।

বুঝতে পারছিলাম, মানুষ টা কে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে আমার দিনে আজ আমার গায়ে হলুদ। চারিদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ।কত আয়োজন,কত হৈ-হুল্লোড়। কিন্তু এসব আয়আমাকাছে অনর্থক মনে হচ্ছে।

মনে হচ্ছে,এসব কিছু গোল্লায় যাক। কতক্ষণে আমি তারেক কে নিজের করে পাবো সেই অপেক্ষার প্রহর গুণছি ফুলশয্যার রাতে জানালার দিকে মুখ করে বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফুলের পাপড়িগুলোর উপর দুজন পাশাপাশি বসে আছি, আকাশে ভরা জোৎস্না।

জানালার ফাঁক দিয়ে সেই জোৎস্নার আলো আমাদের গায়ে এসে ঠিকরে পড়ছে। তারেক আমার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে চোখে চোখ রেখে বললেনহিজরাদের বিদায় দিয়ে সদর দরজা টা খোলা রেখে আমি আবার ড্রয়িংরুমে এসে বসলাম।

একটু পর পরণের টি-শার্ট টা কোমরে বেঁধে লেংড়াতে লেংড়াতে রুম থেকে বের হয়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল ফারহান। ওর নাজেহাল অবস্থা দেখে মনে মনে খুব স্বস্তি পাচ্ছিলাম।

বাসায় ফিরে ঘরে ঢুকেই ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে মেঝেতে বসে হাউমাউ করে কাঁদতশুরু করে দিলাম। গোসল সেরে বের হয়ে ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছছিলাম সময় মা আসলেন.

ব্যাগ নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে ফারহানের কাছে এগিয়ে গেলাম আবারআজকের এই ঘটনা ঘুণাক্ষরেও যদি কেউ জানতে পারে তাহলে আমার ফোনে যে ছবিগুলো নিলাম সেগুলো গার্লস গ্রুপে ভাইরাল হয়ে যাবে। তখন তোর ইমেজ আর রেপুটেশনের মায়রে বাপ করে দিবে পাবলিক।

এখানে তো সব চার দেয়ালের মধ্যে হয়েছে,কিন্তু গার্লস গ্রুপে তোআর হ্যাঁ,তোর রুমমেট সায়েম কে বলে দিসওর প্রেজেন্ট গার্লফ্রেন্ড ঈশিতা আমার কাজিন হয়।ঈশিতা কে আমিই বলেছিলাম সায়েম কে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে যেন সায়েমের মাধ্যমে ঈশিতা তোর খবরাখবর আমাকে দিতে পারে।

গত তিনমাসে তোর কার্যকলাপ আমার কাছে সুবিধের ঠেকছিলো না তাই ঈশিতা কে গোয়েন্দাগিরি তে লাগিয়েছিলাম। আমি যেমন তোর কাছে সায়েমের প্রশংসা করে সায়েমের কুকীর্তিগুলো তোর পেট থেকে বের করতাম ঠিক তেমনি ঈশিতাও সায়েমের কাছে তোর প্রশংসা করে ওর পেট থেকে.

তোরকুকীর্তিগুলো বের করতে সক্ষম হয়েছিশালা দুটোই এক গোয়ালের গরু। রাত বিরাতে ঈশিতা যখন সায়েমের সাথে কথা বলতো,পাশ থেকে তোর চুম্মাচাটি শুনতে পেতো।সায়েম কে জিজ্ঞেস করলে সে গড়গড় করে সব বলে দিতো। কোনোদিন প্রীতির সাথে আবার কোনোদিন শায়লার সাথে.

এভাবে একেকদিন একেকজনের সাথে তোর ফোনসেক্সের খবর সায়েম ই ঈশিতা কে দিয়ে দিতোঅথচ আমার সাথে কথা বলার সময় রাত ১২ টা বাজতে না বাজতেই তুই ফোন রাখার জন্য অস্থির হয়েড়তি। কোনো না কোনো অজুহাতে ঠিক ই ফোন রেখে দিতি। এবার বুঝবি মজা।

বাবাকে জানিয়ে আসলাম,গত সপ্তাহে যে পাত্রপক্ষ আমাকে দেখতে এসেছিলো তাদের সাথে কফাইনাল করতে। তারপর রুমে এসে ফারহান কে কল দিয়ে বললাম-কাল আমরা কাজী অফিসে গিয়ে বকরছি,ও যেন সব ব্যবস্থা করে রাখে। এখন শান্তি লাগছে খুব।

বাবাও খুশি,সাথে প্রেমিকও সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে যাওয়ায় খুব তাড়াহুড়ো লেগে গেল।কোনোরকমে রেডি হয়ে তড়িঘড়ি করে নাস্তা করে বের হতে নিচ্ছিলাম,এমন সময় মা প্রশ্ন করবসলেন.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *